সিঙ্গারার সাথে যেনো পুরো শহরের বিরোধ হয়েছে। ফলে শহরে জারি হয়েছে নতুন আইন; কোথাও সিঙ্গারা বিক্রি হবে না। তাই শহরের কোথাও সিঙ্গারা পাওয়া যাচ্ছে না।
এমন মৃদু রোদের মিষ্টি দুপুরে যখন খিদে পেলো তখন ভাবলুম ঘপাঘপ দুটো সিঙ্গারা ঠুসে আসি। মডেলের মাঠের কোণায় এক লোক সিঙ্গারা বানায়। ওর ব্যবহার ভালো না। কাস্টমারকে সে থোরাই কেয়ার করে। সিঙ্গারাও যে খুব ভালো বানায় তা না। তবে ওর দোকানের সিঙ্গারার সাথে জড়িয়ে আছে বাল্যকালের স্মৃতি। বন্ধুদের সাথে নিয়ে প্যাভিলিয়নে বসার পরে যখন খিদে পেতো, তখন হয় চকচক ঝকঝক করা টাক মাথার মামার থেকে চটপটি খেতাম নয়তো ওই লোকের দোকানের সিঙ্গারা। ফলে কোনো এক অদৃশ্য কারণেই সিঙ্গারা খেতে পথ ধরলাম ওই লোকের দোকানে।
দোকান বন্ধ। পাশেই বসে আছে এক বুড়ো। তার আবার মুদি দোকান। নিঃসন্দেহে শালা একটি গালি। নাহলে বলতাম এক শালার দোকান। এ লোকের ব্যবহারও খুবই জঘন্য। নেতার বলয়ে দোকানপাট দিলে ব্যবহার এমন হবে এ-ই স্বাভাবিক। তবুও এখানকার স্থানীয়দের কোনো অভিযোগ নেই। ফলে ব্যবহার ভালো হবে এই আশা করে নিজেকে বোকা প্রমাণ করতে ইচ্ছুক না।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবলাম শহরের কোথাও সিঙ্গারা পাওয়া যাবে কিনা। ল্যাবরেটরির ভেতর থেকে মডেল এলাকা, কোথাও সিঙ্গারা পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তাই নিয়ত করলাম বাঙলা কলেজ হতে টেকনিক্যালটা ঘুরে আসি। কোথাও যদি সিঙ্গারা পাওয়া যায়, মন্দ কী!
যেই ভাবা সেই কাজ। হাঁটতে হাঁটতে দেখলাম কতগুলো দোকান! পপস, ড্রাই কেক, কলা ঝুলছে তাদের ডিসপ্লেতে। কাচের বয়ামে সল্টেড বিস্কুট! দেখেই বোঝা যায়, মুখে দেওয়া মাত্রই গলে যাবে। সাথে যদি এক কাপ দুধ চা থাকে, উফ! কথাই নেই।
তবে একজন সিঙ্গারাখোরের সামনে এসব লোভ কিছুই না। তার আগে দরকার সিঙ্গারা। এরপর চা। দুটোকেই আমি সমান্তরালে ভালোবাসি। কমবেশি নেই। প্রমাণ চাইলে অন্তরটাকে টুকরো করে দেখাতে পারি। এ অন্তরে শুধু চা-সিঙ্গারার বসবাস।
কেউ ছোলা বিক্রি করছে, কেউ গরমাগরম দুধ, কেউ ঠান্ডা আইসক্রিম আবার কেউ ঝালমুড়ি। এক মহিলা ভাত আর লাল টকটকে গরুর মাংস বিক্রি করছে। আরেকজন তৃপ্তি নিয়ে খাচ্ছে। সাদা ভাতে ঝোল মেখে মুখে দিয়ে যেই না মাংসে কামড় দিলেই বোধহয় দুনিয়ার সর্বোচ্চ শান্তি পাওয়া যায়। কিন্তু ওই গরুর মাংসের লোভও হার মেনে গেল সিঙ্গারার কাছে।
একটা মাঝবয়সী লোক বৌ না খুঁজে খুঁজছে সিঙ্গারা, এমন কথা রটে গেলে মুখ লুকানোর জায়গাও পাবো না। কিন্তু কবিদের এত ভাবলে চলে না। যেহেতু জীবনে বহুবার কিছু লাইন লিখেছি তাই নিজেকে কবি ভেবেই আপাতত সান্ত্বনা দিলাম।
শহরের শেষ প্রান্ত তথা টেকনিক্যাল মোড়ে এসে হার মানতে হলো। মেনে নিতে হলো বাস্তবতা। কবিদেরও মানতে হয়। কিছু করার নেই। এখন আর এ শহরে সিঙ্গারা পাওয়া যায় না।
ফিরতে ফিরতে খাঁটি গরুর দুধের চা খেলাম। চোখের সামনে দেখতে পেলাম দুধ মেশানো পানি অথবা পানিতে পাউডার দুধ, তবু দাড়িওয়ালা চাচা বললেন খাঁটি গরুর দুধ। আমিও তাই খেলাম। যে জীবনে সিঙ্গারা পেলাম না, সে জীবনে এত বাছবিচার করে লাভ কী?
সিঙ্গারা না পেয়ে ক্ষুধার্ত পেটেই হেঁটে চললাম আগের স্থানে। কবিরা ক্ষুধার্তই থাকে। তাদের পেটে সিঙ্গারা পড়ে না। এভাবেই অভুক্ত থেকে কবিদের মৃত্যু হয়। আমারও হয়তো হবে। সামান্য সিঙ্গারার অভাবে এক সৃজনশীল কবির মৃত্যু হবে! এই রাষ্ট্র, এই সমাজ, এই বুদ্ধুজীবী সুশীলের দল তখন কী জবাব দেবে?