চারপাশটা বেশ অন্ধকার৷ রাতে চারপাশ অন্ধকার থাকবে এটাই নিয়ম৷ কিন্তু সবখানে এ নিয়ম চলে না৷ যেমন চলে না মিরপুরের এই ছোটো এলাকায়৷ রাত দুটো হোক বা তিনটে। চারপাশ ঝিলমিল করে আলোতে৷
আজ কী হয়েছে আমি জানিনা৷ ছাদে উঠে দেখতে পেলাম সব অন্ধকার৷ না, এ ছাদ উঁচু না৷ তার মানে এতটাও ছোটো না যে কেউ পড়ে গেলে বেঁচে থাকবে। পাঁচতলা। তার ওপর ছোটো একটা টাংকি ঘর। পাশে একটা উঁচু দেয়াল। সেখানে পা দুলিয়ে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি।
অথচ এখন আমার থাকার কথা ছিলো নদীর পাশে। সে-বারের মতন৷ আকাশে মেঘ জমে থাকবে। নদীর ঢেউগুলো হবে উশৃঙ্খল। তীরে এসে আঘাত করবে বিদ্রোহীর মতন৷ আমি তখনো তাকিয়ে থাকবো। তখন অবশ্য বিদ্যুৎ চমকালে ভয় পাবো না৷ নাফরমান আমার মনও খোদার সৃষ্টি দেখে বিস্ময়ে বলে উঠবে সুবহানাল্লাহ।
দূরে একটা নৌকা দুলতে থাকবে। লাল নীল একটা বাতি জ্বলবে৷ নদীর এমন ভয়ংকর রূপ দেখা সত্ত্বেও মাঝি ঘরে ফিরবে না। আরও একটা ইলিশের আশায় সে বসে থাকবে নৌকার কোলে। তীব্র আশা নিয়ে গান ধরবে গলা ছেড়ে। সে গান অবশ্য শুনবে না কেউ৷
আমার থেকে কিছু দূরে থেকে আগের মতই তানভির শুয়ে থাকবে ঘাসের কোলে৷ কিছু ভাবতে থাকবে সে৷ হয়তো ভাববে প্রেমিকার কথা৷ তার কি প্রেমিকা আছে? না, নেই৷ তবে কার কথা ভাবে সে? যে ছেড়ে যায় মাঝপথে? নাকি ভাবতে থাকে তার আব্বার কথা৷ শত ক্ষোভ থাকলেও, এ লোকটা যে তাকে বড়ো করছে৷ এখন যে বয়স বাড়ছে তার৷ সেসব নিয়ে কি আদৌ মাথা ঘামায় তানভির?
বাতাসের তালে নাচতে থাকা ডালগুলোর নিচে বসে সালেহুল চোখ বন্ধ করে আছে৷ হয়তো সে ঘুমিয়ে গেছে৷ অথবা হারিয়ে গেছে স্মৃতির অতলে। হয়তো তার সামনে ভেসে উঠছে কারও সাদাকালো ছবি৷ কোনো একটা পোকা এসে বসে তার গালে। সে পোকাটিকে তাড়ায় না৷
সালেহুল বা তানভির, দুজনেই আমার থেকে বেশ খানিক দূরে৷ আমার কাছাকাছি যে বসে আছে সে রাফিন। সে থাকা না থাকা সমান৷ তার দেহ থাকে দুনিয়ায়, রূহ চলে যায় কবিতার দুনিয়ায়। সাজাতে থাকে ছন্দ। কবিতার মূল উপাদান দু:খ৷ কিন্তু রাফিনের দু:খ কী? আজ অবধি তার দু:খি হবার কারণ দেখিনি৷ তবুও সে কবি।
বায়জিদ গান ধরে৷ সবচাইতে দূরে দাঁড়িয়ে আছে সে৷ আজ নাকি তার বাবার কথা মনে পড়েছে৷ তাই ভীষণ মন খারাপ। একারণেই আজ সে নদীর ধারে। নদী; সেতো এক জনম দু:খিনী।
বায়জিদের গানের সুর আমাকে নিয়ে যায় কোথায় যেনো। আমি শুধু দেখতে পাই, কাজল চোখের একটি মেয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। সে হাসে। আমি তলিয়ে যাই সে-ই হাসিতে। তাকে বড্ড আপন মনে হয়। যেই হাত বাড়াই, অমনি দূরে চলে যায় সে। আর আসে না৷ আর তাকে দেখা যায় না। আমাদের আর কখনো দেখা হয় না৷
দীর্ঘশ্বাসের সাথে সাথে আমি ফিরে আসি নদীর ধারে। কী সুন্দর আকাশ। কী সুন্দর নদী। দূরের নৌকাটি চলে যায়, বহুদূরে। হয়তো জেলের আশা পূর্ণ হয়। তাজা ইলিশ নিয়ে হয়তো ফিরছে নিজ ঘরে। জেলেটির মতন আমারও আশা আছে। ক্বমরুদ্দিন আর রাফির আবারও মোলাকাত হোক। আমাদের সকলের দেখা হোক৷ আবারও তোলা হোক ছবি। মোছা হোক তিক্ত স্মৃতি৷ নাইবা হোক এসব, তবু তাদের কথা হোক৷ কথা হোক। কথা হোক।