আমি দাঁড়িয়ে আছি বাসের ঠিক গেইটে৷ কোনো সীট পাইনি৷ তবুও ঘরে যে ফিরতেই হবে৷ দাঁড়িয়ে যে যেতে পারছি এই অনেক! আমার মতন মানুষকে যে দরজায় দাঁড়াতে দিয়েছে এজন্য আমার দুই রাকাত শোকরানা নামাজ পড়া উচিত।
গাড়িটি হুট করে বামে মোড় নিলো। কারণ হিসেবে জানলাম, দুটো ভার্সিটি মারামারি লেগেছে, তাই রাস্তা ব্লক। বেশ৷ এই সুবাদে একটা মাঝারি জার্নি হবে, মন্দ না৷ আজ নাহয় ঝুলে ঝুলেই যাওয়া যাবে৷
আমার ঠিক পেছন বরাবর সীটে দুটো মেয়ে বসেছে। গল্পের আসর বসিয়েছে তারা। কখনো ফিসফিস করে গল্প করছে৷ আবার কখনো হেসে উঠছে হো হো করে৷ কখনো একে অপরের কাঁধে কাঁধ রাখছে, তো কখনো একটু দূরে গিয়ে নতুন গল্প বলছে৷ যেনো ঠাকুমার একটা ঝুলি আছে তাদের কাছেও। আকাশের দিকে তাকানোর আগে তাদের চোখে চোখ পড়লো। একটি মেয়ের চোখের রঙ বাদামি৷ তাকিয়ে থাকলে মোহ লাগে৷ এমন চোখ সচরাচর উপেক্ষা করা যায় না৷ তাই পুরুষের উচিত নিচে তাকানো।
কিন্তু পুরুষ বরাবরই বিদ্রোহী৷ আমিও তেমনই। তাই নিচে না তাকিয়ে তাকালাম ওপরে। শরতের আকাশের বুক চিড়ে উড়ে যাচ্ছে একপাল সাদা মেঘ। তাদের কোনো তাড়া নেই। বেশ ধীরে। এসব দেখে বোধহয় মন খারাপ হয়৷ বোধহয় না, আসলেই হয়৷ তবুও দেখি৷ তখন অদৃশ্যভাবে মিষ্টি কণ্ঠে ভেসে আসে ১২ বছর আগের কোনো গান। যে কণ্ঠ আর কেউ শুনতে পায় না। শুধু আমি শুনি৷ এ কণ্ঠ কখনো গান গায়, কখনো কবিতা আবৃত্তি করে৷ মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি মনে হয় একজন ছোটোখাটো পাগল। কোনো স্বাভাবিক মানুষের সাথে কি এমন হয়? হয় না৷
কারো কথায় কান পাতা ঠিক না৷ যেহেতু মোরালিটির বালাই নেই, তাই আমি কান পাতলাম। সেই অদ্ভুত চোখের বালিকাদের কথার মাঝে৷ তারা বলছে,-
- তুমি চা বানাতে পারো? আমার আজকে চা খেতে হবে৷ প্রচণ্ড মাথা ধরেছে। ঝামেলা হলো আমার চা হয় না।
- আমি বানাই। কিন্তু গরম পানি হয় শুধু। চা ঠিকঠাক হয় না৷ আম্মু বানিয়ে দেয়। আমি শুধু খাই।
- আন্টির থেকে রেসিপিটা জেনে আমাকে পাঠিও।
- আচ্ছা পাঠাবো৷
এত বড়ো মেয়ে, অথচ চা বানাতে পারে না! গ্রাম্য চাচির মতন নিন্দা করে বলতে মন চাইলো, "ছি, ছি৷ কিসব অলক্ষুণে কথা! এত বড়ো ছেড়ি৷ চা বানাইতে পারে না!ছি"
কিন্তু আমি দেখতে খারাপ এটা ঠিক, তাই বলে খারাপ মানুষ নই। মেয়েটিকে চা বানানো শিখিয়ে দিতে চাইলেও সাবের সাহেবের "কোথাও নিঝুম হয়েছে কেউ" গিফট দিতে পারতাম৷ কিন্তু দিলাম না৷ কারণ ভদ্রলোকের সাথে চা নিয়ে আমার ব্যাপক বিরোধ৷
চা বানানো সোজা। চুলা ধরিয়ে পাতিলে পরিমাণ মতন পানি নিতে হবে৷ তারপর প্রেমে পড়লে হৃদয় যেমন ফোটে, পানি সেভাবে ফোটা অবধি অপেক্ষা করতে হবে৷ মায়ের গোছানো বয়াম থেকে একটা এলাচ, দারচিনি, লবঙ্গ ছুঁড়ে ফেলতে হবে গরম পানিতে; চাইলে দেয়া যাবে আদাও৷ এবার প্রেমিকার ফিরে আসা অবধি অপেক্ষা। প্রেমিকা ফিরে এলেই ফুলেরা তার সুবাস ছড়াবে। তখন কিছুটা এ-গ্রেডের চা পাতা দিতে হবে গরম পানিতে৷ আবারও অপেক্ষা৷ মনে রাখতে হবে, প্রেম মানেই অপেক্ষা৷ আর তীব্র প্রেমেই তৈরি হয় চা৷ যার মাঝে প্রেম নেই, সে চা বানাবে কী করে!
একটু বাদেই ঘ্রাণ ছড়াবে ঘর জুড়ে। পাতিলের কাছে গিয়ে বুক ভরে শ্বাস নিতে হবে তখন, গভীর শ্বাস৷ যে শ্বাসের ফলে একটা চুমুক দেয়ার জন্য উজ্জীবিত হবে দেহের সকল কোষ। তারপর পাতিল উঠিয়ে কাপে ঢেলে দিতে হবে খুব যত্ন করে৷ পরিমাণমতন চিনি দিয়ে টুংটাং শব্দ করতে হবে৷ কারণ প্রেমে শব্দ খুবই জরুরি।
নিজ গন্তব্যে চলে এলাম৷ এবার যে নেমে যাওয়ার পালা৷ শুনেছি স্রষ্টা মেয়েদের অদ্ভুত ক্ষমতা দিয়েছেন। মায়ের মতন, তারাও মনের কথা আঁচ করতে পারে। এ মেয়ে দুটো কি পেরেছে? তারাও কি প্রেমিক হতে পারবে? তা জানার আগেই বাস চলে গেলো অনেক দূরে অনেক। অজান্তেই ভেতর থেকে কে যেনো বলে উঠলো, "ভালো থেকো বাদামি চোখের সাবালিকা।"