তুরাগের পাড়ে এসেছি৷ সন্ধ্যা নামার পরপর৷ সন্ধ্যা নামলেও আকাশে তখনো ভেসে বেড়াচ্ছিলো বিকেলের সাদা মেঘ। তারা যেনো দিনের কাজ চুকিয়ে ঘরে ফিরছে। মৃদু বাতাসে দুলছে ওয়াকওয়ে ঘেষে দাঁড়ানো গাছটা৷ আমি সে ওয়াকওয়ে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি পশ্চিমের পানে৷
ওয়াকওয়ের রেলিংয়ে বসে আছে স্থানীয় গ্যাং৷ কেউ সিগারেট ফুঁকছে৷ কেউ মোবাইলে গেম খেলছে৷ আর কেউ কেউ বর্ণনা দিচ্ছে একটু আগে হেঁটে যাওয়া একটা মালের। যদি কাছে পেতো, তবে কী করতো এটাই হলো তাদের আলোচনার বিষয়বস্তু৷ উপস্থাপক বেশ রসিয়েই আলোচনা করছে, আর তার মজা নিচ্ছে ষোলো বছরের ছেলেপেলেরা। তাদের চোখ লাল, বড়ো বড়ো।
আমি এগিয়ে চলছি সামনের দিকে। একটু নিরিবিলি পরিবেশ চাই৷ যেখানে কোনো কোলাহল নেই৷ যেখানে কোনো শব্দ নেই৷ সেখানে দাঁড়িয়ে, গালে হাত দিয়ে বিষণ্ণ বুক নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকবো। আচমকা আকাশে ভেসে উঠবে পুরোনো স্মৃতি। প্রেমিকার হাসির কথা মনে পড়বে, মনে পড়বে একই বেঞ্চে বসে আড্ডা দেয়া বন্ধুর কথা। আরও কত কী মনে পড়বে!
আকাশে আজ চাঁদ উঠেছে। পূর্ণিমার চাঁদ৷ লজ্জাবতী বৌ যেমন নিজের চেহারা আঁচলে ঢাকে, তেমন চাঁদও তার চেহারা ঢেকে ফেলছে মেঘের আঁচলে৷ যেনো সদ্য বিয়ে করা স্বামী তাকিয়ে আছে তার দিকে। আর তাই সে ভীষণ লজ্জা পাচ্ছে৷
হাতের ডানপাশেই একটা চায়ের দোকান। দোকানটা পেরুলেই শুরু হবে অন্ধকার৷ এরপর তা ঘন হবে৷ বাতাসের প্রবাহ বাড়তে থাকবে। শো শো শব্দ হবে৷ তারপর দীর্ঘপথ ঠিক এমন নিরিবিলিই থাকবে। এর মাঝে যেখানে গিয়ে বুকে ধুকধুক শব্দ হবে তার ওপারে আর যাওয়া যাবে না৷ তখন বিপদ হবে৷ ভয়াবহ বিপদ৷
চায়ের দোকানে কড়া লিকার চায়ের আড্ডা বসেছে৷ দাঁড়ি পাঁকা মুরুব্বিরা গালাগাল দিচ্ছেন সরকার দলিও লোককে। বিড়িখেকো বুড়ো কাকা বলছেন - "জমাত আইলেই ভালো হইতো।"
দোকান পেরিয়ে কিছুদূর এগিয়ে এসেছি। কিছুদূর না, বেশ অনেক দূর। দোকানের আলো বেশ ছোটো দেখাচ্ছে৷ আমি হাঁটা বন্ধ করেছি। না, বিপদ সীমায় পৌছাইনি, বুক ধকধকও করছে না। থেমেছি কারণ আচমকা আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে কমরুদ্দিন পাহাড়ি৷
এ নতুন কিছু না৷ বাস্তব জীবনে যেমন সাহিত্যের পোস্টেই হুটহাট বানানের ভুল ধরে পাহাড়ি, তেমনি আজকাল আমার জীবনেও হুটহাট চলে আসে। আসবি ভালো কথা৷ বলে তো আসবি? তা না৷ সামনে এসে দাঁত কেলিয়ে দেবে। আর জিজ্ঞাসা করবে, "ভয় পাইছেন ভাই?" এর ব্যতিক্রম আজও হলো না৷
- ভয় পাইছেন ভাই?
- ভয় পাবো কেন?
- না মানে হুটহাট সামনে এলাম তাই।
- নতুন কিছুতো না৷ সবসময়ই আসেন৷
- ভাই কি রাগ করছেন?
- এমন ভাবে বলছেন যেনো রাগ করলে আর আসবেন না?
- তার নিশ্চয়তা নাই আসলে।
নদীর মাঝ দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে একটা বালুর ট্রলার৷ এর আসল নাম কি তা আমি জানিনা। শুধু জানি বালু টানে। আমার কেন জানি মন চাইলো ওটার ছাদে উঠে চিত হয়ে শুয়ে আকাশ দেখতে পারলে ভালো লাগতো।
- কমরুদ্দিন।
- বলেন ভাই।
- বলেন তো, চাঁদকে কেন মায়াবতী বলে? পুরুষ কেন বলে না?
- কেন?
- কারণ চাঁদ সাদা রঙের।
- আচ্ছা। হঠাৎ এমন প্রশ্ন?
- বলুন তো আপনার গায়ের রঙ কি?
- সাদ.. ধুরু মিয়া। আপনি এইভাবে আমাকে সর্বদা অপমান করেন৷ এটা ঠিক না৷ আপনার কাছে পরামর্শ চাইলেও খালি নেগেটিভ কথা বলেন। আপনি আগাগোড়া একটা ন..
- নটী?
- ভাই আপনার মুখে কিছু আটকায় না? ইছ।
একটা চড়ুই এসে রেলিং এ বসলো তখন। তার চোখদুটো অসম্ভব রকম লাল। পাখিতো গাঁজা খায় না, তাহলে এর চোখ লাল কেন? ভাবতে ভাবতে বললাম,
- পাহাড়ি
- আবার কী?
- আচ্ছা, দাঁড়ি টুপি পরা কেউ যদি হোটেলে মেয়ে নিয়ে যায় সেটা বেশি অপরাধ? নাকি জেনারেল কেউ গেলে অপরাধ?
- আলবত দাঁড়ি টুপিওয়ালা।
- কেন?
- কারণ সে জানে বোঝে তাও গেছে৷
- দাঁড়ি টুপি থাকলেই সে জানবে বুঝবে এর প্রমাণ কী?
কমরুদ্দিন আমার দিকে তাকিয়ে আছে৷ কিন্তু আমি তাকাচ্ছিনা। একজন পুরুষের দিকে এভাবে তাকানোর মানে হয় না। কী বিদঘুটে!
- দুইটাই একই অপরাধ পাহাড়ি। দুজনেই দোষী। কেউ কমবেশি না। চাহিদা যেমন শার্টপ্যান্ট পরা ভদ্দরলোকের আছে, তেমন চাহিদা আছে দাড়ি টুপিওয়ালা মওলানা সাবের৷ ব্যাপারটা এখানে চাহিদার৷ মোরালিটি আর এথিক্সের। কাপড়ের কারণে কেউ কমবেশি দোষী না। বুঝলে?
- মানিনা৷ নিশ্চয়ই মওলানা বেশি দোষী।
- কারণ ও ব্যাখ্যা দাও।
- আমি জানিনা।
- তাহলে?
- নিশ্চয় রাফি ভাই জানে।
- সে এখন বিয়ে খেতে ব্যস্ত। আসবেনা এখানে।
- আরেকজন তো আছে৷
হ্যাঁ, আছে। মূলত তার অপেক্ষাতেই আছি। তার কাছে আসে মীর্জা গালেব। বেশ বড়ো ব্যক্তি।
বালুর ট্রলারটি চলে গেছে অনেক দূরে। নদীর ওপারে কারা যেনো আগুন জ্বালিয়েছে। দাউ দাউ করে জ্বলছে। আর আমি ভাবছি সে কোথায়। কোথায়?
"খালিদ হাসান, তুমি কোথায়?"