এখন মাঝ রাত৷ বিদ্যুৎ চমকাইতেছে আকাশে৷ কালা রঙের আকাশ এক সেকেন্ডের লাইগা ধবধবে সাদা হয়ে যাইতেছে৷ তার একটু পরেই বিকট আওয়াজে কাঁইপা উঠতেছে গোটা শহর। সাথে দমকা হাওয়া। এই হাওয়া দোল দেয় গাছের পাতায়, নদীর পানিতে৷ মাঝে মাঝে এই হাওয়া দোল দেয় মানুষের মনেও৷ তখন ঐ মানুষ হইয়া যায় দু:খী।
নদীর পাড়ে বইসা আছি আমরা কয়েকজন৷ যারা আছে এরা সবাই আমার কাছের মানুষ। যদিও চিন্তা চেতনায় আমার থেকে যোজন যোজন দূরে৷ কেউকেউ ভাবুক, কেউ আবার দার্শনিক, কেউ রাজনীতিক আবার কেউ আমার মতন কিছুই না৷ তোনভিরুল, রোফিনুর, সোলহুল আর আমি এই মূহুর্তে বইসা আছি নদীর পাড়ে৷ বিশাল এক নদী৷ জোরে জোরে বইয়া যাইতেছে হাওয়া৷ তাই নদী হাওয়ার সুরে কলকল কইরা গান গাইতেছে৷ চাইরপাশ বেশ অন্ধকার৷ আইজ আকাশে চাঁদ উঠে নাই৷ উঠলেও মেঘের কারণে বোঝা যাইতেছে না৷ বেশ দূরে লাল নীল একটা বাতি নদীর টানে ভাইসা যাইতেছে। সম্ভবত কোনো ট্রলার৷
আমরা সবাই-ই নীরব৷ একসময় কত আড্ডা হইতো আমাগো৷ নারুতো নিয়া তোনভিরুলের ঘন্টার পর ঘন্টার আলাপ, ক্রিকেট নিয়া সোলেহুলের আলাপ, ফুটবল নিয়া রোফিনুরের আলাপ৷ গার্ডেনের চিপায় বইসা একসময় পুরা দিন ধইরা আড্ডা দিতাম আমরা৷ যদিও গার্ডেন পছন্দ ছিলো না আমাগো কারোরই৷
আইজকাল সোলেহুলের দেখা পাওয়া যায় না৷ শুনছিলাম তারে মাঝে মাঝে রাজশাহীর রাস্তায় দেখা যায়৷ ভবঘুরের মতন হাঁইটা বেড়াইতেছে৷ মাঝে মাঝে রাজনৈতিক ভাবনা নিয়া আলাপ করে অনলাইনে৷ এই পোলায় বুঝে না এই দ্যাশে রাজনীতির স্বপ্ন দেখা পাপ। অবুঝ সোলেহুল হাঁটতে হাঁটতে খুইজা বেড়ায় কোয়ার্টারের সোনালী দিনগুলা৷ তার মনে পইড়া যায় বেদাতিরে একটা বই দিছিলো মাতাল হাওয়া নামের৷ ঐটা বেদাতি নষ্ট কইরা ফালাইছে৷ আবার দিঘির জলে কার ছায়াগো বইটাও ফেরত দেয় নাই শালায়৷ সে ভাবে বেদাতিকে মাফ করা যায় না৷ দাবি রেখে দেবে৷ আবার কী ভাইবা মাফ কইরা দেয়৷ নিজের এই অদ্ভুত কাজ দেইখা নিজেই মুচকী হাইসা উঠে৷ তয় নিজেরে অভাগাই মনে হয় তার৷ কেন যে সবাইরে ছাইড়া রাজশাহীতে আইলো।
গার্ডেনের লেজের পাশের ছাউনিতে একটা পোলারে প্রায়ই দেহা যায়৷ কানে হেডফোন৷ হাতে মোবাইল। অথচ উদাস হইয়া তাকায়া থাকে আসমানের দিকে৷ যেনো আসমান তার কোনো এককালের প্রেমিকা। প্রেমিকারে যত দেহা যায় ততই সুন্দর লাগে৷ জানা যায় পোলাডার নাম তোনভিরুল। সপ্তাহের প্রায় সময়ই তারে দেখা যায় এখানে৷ কেউ নাই তার চারপাশে৷ মনে হয় সে একা৷ ভীষণ একা৷ কী তার দু:খ? সে কেন নিজেরে গুছায়া নেয় না? এর উত্তর সে নিজেও জানেনা৷ শুধু জানা নাই সে একা৷
আজকাল নাকি পরিবারের লোকদের সাথেও কথা বলা বন্ধ কইরা দিছে রোফিনুর৷ একসময় কবিতা লেখতো সে৷ যে কবিতায় পাওয়া যাইতো বিরহের স্বাদ৷ আমার প্রায়ই মনে হইতো রোফিনুরের হয়তো কখনো প্রেম ছিলো৷ কিন্তু আমি কখনোই তা প্রমাণ করতে পারি নাই৷ রোফিনুর এখন আর কবিতা লেখে না৷ ছিইড়া ফালাইছে খাতাপত্র৷ শুনেছি আজকাল বারান্দা দিয়া তাকায়া থাকে বাইরের পথে৷ মানুষের যাতায়াত দেখে৷ গাড়ির চলাচল দেখে৷ আরো দেখে আকাশে ভাইসা যাইতেছে কিছু কালো রঙের কাক। আচমকা একদিন রোফিনুর নক দিয়া কইলো, "আব্বারে মনে পড়ে৷" এরপর থেইকা তার খোঁজ পাই নাই৷
কতকাল পর একত্রিত হইছি। অথচ আমাগো কারো মুখে কোনো কথা নাই। যেনো আমাগো ক্লাশ টিচার বেত নিয়া শাসাইতেছে, "তোরা কথা কবি না৷" আইজ আমরা কথা বলবো না৷ আমাদের সব কথা সবার জানা৷ আমরা একসাথে বহুত হাসছি৷ একসাথে বহুত দু:খ ভাগাভাগি করছি৷ তাই আইজ আমরা কিছুই বলবো না৷ শুধু আমরা আকাশ দেখবো৷ কুচকুচে কালো আকাশ। যে আবার পরছে মেঘ রঙা শাড়ি৷ তাই তারে দেখা যাইতেছে না৷ দমকা হাওয়া বইতেছে আবার। দূর থেইকা ভাইসা আসতেছে নাম না জানা প্রাণীর ডাক।
Comments
Post a Comment