Skip to main content

একটি রাত ও আমরা সবাই । নাঈম খন্দকার রুম্মান

 এখন মাঝ রাত৷ বিদ্যুৎ চমকাইতেছে আকাশে৷ কালা রঙের আকাশ এক সেকেন্ডের লাইগা ধবধবে সাদা হয়ে যাইতেছে৷ তার একটু পরেই বিকট আওয়াজে কাঁইপা উঠতেছে গোটা শহর। সাথে দমকা হাওয়া। এই হাওয়া দোল দেয় গাছের পাতায়, নদীর পানিতে৷ মাঝে মাঝে এই হাওয়া দোল দেয় মানুষের মনেও৷ তখন ঐ মানুষ হইয়া যায় দু:খী।

নদীর পাড়ে বইসা আছি আমরা কয়েকজন৷ যারা আছে এরা সবাই আমার কাছের মানুষ। যদিও চিন্তা চেতনায় আমার থেকে যোজন যোজন দূরে৷ কেউকেউ ভাবুক, কেউ আবার দার্শনিক, কেউ রাজনীতিক আবার কেউ আমার মতন কিছুই না৷ তোনভিরুল, রোফিনুর, সোলহুল আর আমি এই মূহুর্তে বইসা আছি নদীর পাড়ে৷ বিশাল এক নদী৷ জোরে জোরে বইয়া যাইতেছে হাওয়া৷ তাই নদী হাওয়ার সুরে কলকল কইরা গান গাইতেছে৷ চাইরপাশ বেশ অন্ধকার৷ আইজ আকাশে চাঁদ উঠে নাই৷ উঠলেও মেঘের কারণে বোঝা যাইতেছে না৷ বেশ দূরে লাল নীল একটা বাতি নদীর টানে ভাইসা যাইতেছে। সম্ভবত কোনো ট্রলার৷
আমরা সবাই-ই নীরব৷ একসময় কত আড্ডা হইতো আমাগো৷ নারুতো নিয়া তোনভিরুলের ঘন্টার পর ঘন্টার আলাপ, ক্রিকেট নিয়া সোলেহুলের আলাপ, ফুটবল নিয়া রোফিনুরের আলাপ৷ গার্ডেনের চিপায় বইসা একসময় পুরা দিন ধইরা আড্ডা দিতাম আমরা৷ যদিও গার্ডেন পছন্দ ছিলো না আমাগো কারোরই৷
আইজকাল সোলেহুলের দেখা পাওয়া যায় না৷ শুনছিলাম তারে মাঝে মাঝে রাজশাহীর রাস্তায় দেখা যায়৷ ভবঘুরের মতন হাঁইটা বেড়াইতেছে৷ মাঝে মাঝে রাজনৈতিক ভাবনা নিয়া আলাপ করে অনলাইনে৷ এই পোলায় বুঝে না এই দ্যাশে রাজনীতির স্বপ্ন দেখা পাপ। অবুঝ সোলেহুল হাঁটতে হাঁটতে খুইজা বেড়ায় কোয়ার্টারের সোনালী দিনগুলা৷ তার মনে পইড়া যায় বেদাতিরে একটা বই দিছিলো মাতাল হাওয়া নামের৷ ঐটা বেদাতি নষ্ট কইরা ফালাইছে৷ আবার দিঘির জলে কার ছায়াগো বইটাও ফেরত দেয় নাই শালায়৷ সে ভাবে বেদাতিকে মাফ করা যায় না৷ দাবি রেখে দেবে৷ আবার কী ভাইবা মাফ কইরা দেয়৷ নিজের এই অদ্ভুত কাজ দেইখা নিজেই মুচকী হাইসা উঠে৷ তয় নিজেরে অভাগাই মনে হয় তার৷ কেন যে সবাইরে ছাইড়া রাজশাহীতে আইলো।
গার্ডেনের লেজের পাশের ছাউনিতে একটা পোলারে প্রায়ই দেহা যায়৷ কানে হেডফোন৷ হাতে মোবাইল। অথচ উদাস হইয়া তাকায়া থাকে আসমানের দিকে৷ যেনো আসমান তার কোনো এককালের প্রেমিকা। প্রেমিকারে যত দেহা যায় ততই সুন্দর লাগে৷ জানা যায় পোলাডার নাম তোনভিরুল। সপ্তাহের প্রায় সময়ই তারে দেখা যায় এখানে৷ কেউ নাই তার চারপাশে৷ মনে হয় সে একা৷ ভীষণ একা৷ কী তার দু:খ? সে কেন নিজেরে গুছায়া নেয় না? এর উত্তর সে নিজেও জানেনা৷ শুধু জানা নাই সে একা৷
আজকাল নাকি পরিবারের লোকদের সাথেও কথা বলা বন্ধ কইরা দিছে রোফিনুর৷ একসময় কবিতা লেখতো সে৷ যে কবিতায় পাওয়া যাইতো বিরহের স্বাদ৷ আমার প্রায়ই মনে হইতো রোফিনুরের হয়তো কখনো প্রেম ছিলো৷ কিন্তু আমি কখনোই তা প্রমাণ করতে পারি নাই৷ রোফিনুর এখন আর কবিতা লেখে না৷ ছিইড়া ফালাইছে খাতাপত্র৷ শুনেছি আজকাল বারান্দা দিয়া তাকায়া থাকে বাইরের পথে৷ মানুষের যাতায়াত দেখে৷ গাড়ির চলাচল দেখে৷ আরো দেখে আকাশে ভাইসা যাইতেছে কিছু কালো রঙের কাক। আচমকা একদিন রোফিনুর নক দিয়া কইলো, "আব্বারে মনে পড়ে৷" এরপর থেইকা তার খোঁজ পাই নাই৷
কতকাল পর একত্রিত হইছি। অথচ আমাগো কারো মুখে কোনো কথা নাই। যেনো আমাগো ক্লাশ টিচার বেত নিয়া শাসাইতেছে, "তোরা কথা কবি না৷" আইজ আমরা কথা বলবো না৷ আমাদের সব কথা সবার জানা৷ আমরা একসাথে বহুত হাসছি৷ একসাথে বহুত দু:খ ভাগাভাগি করছি৷ তাই আইজ আমরা কিছুই বলবো না৷ শুধু আমরা আকাশ দেখবো৷ কুচকুচে কালো আকাশ। যে আবার পরছে মেঘ রঙা শাড়ি৷ তাই তারে দেখা যাইতেছে না৷ দমকা হাওয়া বইতেছে আবার। দূর থেইকা ভাইসা আসতেছে নাম না জানা প্রাণীর ডাক।

Comments

Popular posts from this blog

মমতাদি - মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় । Momotadi by Manik Bandopadhyay

  "কেউ যা দেয় না, তুমি তা দেবে কেন?" বাক্যটির কথা সকলেরই মনে থাকার কথা৷ লাইনটুকু পড়েই খিলখিল করে হেসে উঠতো সবাই। সে হাসি দুষ্টু হাসি। ক্লাসের অন্য কোনো স্মৃতি কারও মনে না থাকলেও মমতাদিকে মনে হয়না কেউ ভুলেছে৷ মমতাদিকে ঘিরেইতো ছিলো বাংলা ক্লাসে হাসাহাসির আয়োজন। অন্তত সেই বাঙলা ক্লাসের স্মৃতিকে আগলে রাখায় মমতাদির একটি ধন্যবাদ প্রাপ্য। এখানে শিক্ষার্থীদের দোষ দিয়েও লাভ নেই। গল্পটার আংশিক ছিলো সে বইয়ে৷ মূলটুকুই দেয়া হয়েছিলো বাদ৷ ফলে মমতাদি ঠিক কেমন তা বুঝে ওঠা হয়নি কারোরই৷ তবে ক্লাসে জানা হয়নি বলে আর জানা হবে না, তা কিন্তু নয়। বেনজিন প্রকাশন কর্তৃক প্রকাশিত "মমতাদি" বইটি পড়লেই জানা যায় কে এই মমতাদি৷ বইটিতে স্থান পেয়েছে দুইটি গল্প৷ একটি "মমতাদি" এবং অপরটি "বৃহত্তর মহত্তর।" মমতাদির দু:খের জীবন যাপনের বিষয়টি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে প্রথম গল্পে৷ যেনো গ্রাম বাংলার সংসারের নিত্যদিনের রূপ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় চিত্রায়িত করেছেন রঙ-তুলিতে। এত দূর্দশা অত্যাচারের পরেও স্বামীর প্রতি ভালোবাসার কথা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এই গল্পে৷ "বৃহত্তর মহত্তর" গল্পে আবার একই মমতা...

নাজিম উদ দৌলার প্রহেলিকা । Prohelika by Nazim ud doula

  লেখক নাজিম উদ দৌলার সাথে জার্নি শুরু করেছি তার লিখিত "প্রহেলিকা" উপন্যাসিকাটির মাধ্যমে৷ পড়া শেষ৷ একটি থ্রিলার মৌলিক উপন্যাসিকা৷ শহরে বাচ্চাদের লাশ পাওয়া যাচ্ছে। প্রত্যেকের মাথা ইট অথবা পাথর দিয়ে থেতলে দেয়া৷ অবাক করার বিষয় প্রতিটা লাশের পাশেই পাওয়া যাচ্ছে খুনির ব্যবহৃত জিনিসপত্র৷ খুনি কী তবে এতই বোকা? নাকি এর পেছনে আছে অন্য কোনো ঘটনা? থ্রিলার গল্পের মাঝেও লেখক প্রেমের ঘটনা কানেক্ট করেছেন৷ চরিত্রগুলোকে করেছেন সাবলীল। এছাড়া মূল আসামীর আসামী হয়ে ওঠার গল্পও তুলে ধরেছেন লজিকালি। বাঙালি গোয়েন্দা যেভাবে কথা বলে, ঠিক সেভাবেই কথা বলিয়েছেন তিনি। ফ্ল্যাশব্যাকের সাথে গল্পের কানেকশন ভালোই। তবে একটা বিষয় একটু অবাস্তব লেগেছিলো। কাহিনীর টুইস্টগুলো ভালো৷ মজাদার। সাসপেন্সওয়ালা টুইস্ট না হলেও, টুইস্টগুলো মজাদার৷ একেক চরিত্র, একেক বিশেষত্ব, একেক কাহিনী। পুরোটাকে একটা ডটে এনে মিশিয়েছেন নাজিম উদ দৌলা। আর সে ডটটি হলো "ভালোবাসা।" মূল আসামীকে ধরার অনেক আগেই বুঝে যাওয়া যায় আসামীকে। কয়েক লাইনের কথোপকথনে একটু ভালোমতো খেয়াল করলেই বোঝা যায়৷ এছাড়া সেখানে খুনীর একটা দূর্বলতার কথা অনেক বলে দেয়া...

কাগা সিরিজ - দ্য ফাইনাল কার্টেইন । কেইগো হিগাশিনো । অনুবাদ সালমান হক । কাগা সিরিজের ১০ম বই । Kaga series - The Final Curtain by Keigo Higashino . Bengali translated by Salman Haque . Tenth book of the series .

  কাগা সিরিজের শেষ বই "দ্য ফাইনাল কার্টেইন।" সিরিজটির দশম বই এটি। একটা প্রপার এন্ডিং যেভাবে দরকার সেভাবেই দিয়েছেন কেইগো হিগাশিনো। একটি গলে যাওয়া লাশের সন্ধান পায় পুলিশ৷ পরবর্তীতে জানা যায় নামকরা অভিনেত্রীর বান্ধবী সে৷ ওদিকে একটা ব্রীজের পাশে মারা যায় এক পাগল। এ খুনগুলো কে করলো? ওদিকে কাগার ধারণা তার পারিবারিক সংযোগ আছে এই খুনের সাথে। কীভাবে? এগুলো নিয়েই সাজানো দ্য ফাইনাল কার্টেইন। কাগার মনে একটা প্রশ্ন সবসময়ই ঘুরতো। সেই প্রশ্নের জবাবও পাওয়া যায় এখানে৷ পাওয়া যায় কাগার পরিবারের আদি অন্ত। তার মায়ের ব্যাপারে জানা যায় তথ্য। এই বইয়ে যতগুলো টুইস্ট দেয়া হয়েছে তা এর আগের কাগা সিরিজের বই (৪টা) এর একটাতেও পাইনি। মাথা হ্যাং হয়ে গিয়েছিলো। প্রচুর চরিত্র৷ প্রচুর টুইস্ট৷ অনুমানের বাইরের বিষয় আরকি। কেইগো হিগাশিনো বেস্ট থ্রিলার লেখকদের মধ্যে অন্যতম। এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই৷ শুধুমাত্র গোয়েন্দাগিরি, মারকাট ইত্যাদিতেই ডুবে না থেকে তুলে ধরেন সমাজের বাস্তব চিত্র। তুলে ধরেন নানা দর্শন৷ এই বইটা পড়ে পাঠকের সে বিষয়টি আরও একবার মনে পড়বে৷ প্রোডাকশন-প্রচ্ছদ সুন্দর। তবে সম্পাদনা হয়নি৷ হলেও ভালো হয়নি। অন...