চা আর পরোটা
নাঈম খন্দকার রুম্মান
- এনাম ভাই। আপনার মরার সময় হয়েছে মনে হয়৷
আমার কথা শুনে তার মুখটা কালো হয়ে গেলো৷ এমনভাবে তাকিয়ে আছেন যেনো কিছুই বুঝতে পারছেন না৷
এনাম ভাই আগের মতোই অপ্রস্তুত হয়েই তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে৷ আমি চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছি আর এনাম ভাইয়ের মনের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করছি৷ লোকটা নিশ্চয়ই ভাবছে সামনের মাসের প্রজেক্ট ক্যান্সেল৷ আর কখনো বই রিভিউ করতে দেবেন বলেও মনে হয় না৷
আমি তখন বই পড়ছিলাম৷ এনাম ভাই আমাকে কল দিয়েই বললেন, "দ্রুত আসো বিশাল ঘটনা হইছে।", "কোথায় আসবো?", " মিরপুর-১০, শাহ আলীর পিছনে, রাব্বানী হোটেল৷ ", " খাবারে ভেঁজাল নাকি?", "ধুর মিয়া দ্রুত আসো।"
রাব্বানী হোটেলের মাঝখানের টেবিলে বসে আছেন এনাম ভাই৷ "ছোট, এইদিকে!" বলে ডাকলেন আমাকে৷ আমি গিয়ে তার সামনে বসলাম। উনি পরোটা আর চায়ের অর্ডার দিলেন৷ সিনিয়রদের সাথে থাকার সুবিধা হলো জুনিয়রদের বিল দেয়ার ভয় নেই৷ শরমের কারনে হলেও সিনিয়রকেই বিল দিতে হয়৷ চা চলে এলো। পরোটা দিয়ে ভিজিয়ে খাচ্ছি।
- "জোড়াতালির সংসার প্রায় রেডি।"
- "আচ্ছা।"
- "এইটা বাকি সব বই থেইকা আলাদা। বুঝছো?"
- "জি"
- "ট্রাই করছি স্টাইল চেঞ্জ করার।"
- "হু।"
- "পরোটা আরেকটা নেবা?"
- "না।"
- "বেতন পাইছি বুঝলা। তাই ভাবলাম তোমারে ডাইকা চা খাওয়াই। রিভিউয়ারদের চা খাওয়ানো ভালো। এতে নেগেটিভ রিভিউ দিতে গেলে প্যাটে মোচড় দেয়৷ তখন আর নেগেটিভ কথা মনে থাকে না। হেহে।"
- "তা ঠিক।"
- "পিডিএফটা একটু পড়ে দেখো।"
- "সুন্দর হইছে।"
এনাম ভাইয়ের চোখ মুখে ঝলকানি। খুশির নুর চমকাচ্ছে। ওনার ইচ্ছে হচ্ছে আমার কাঁধে হাত দিয়ে এলাকা ঘুরে বেড়ানোর। একটা মোজো কিনে উনি এক ঢোক খাবেন আমি এক ঢোক খাবো। এরপর পান্ডুলিপি নিয়ে কথা হবে। রয়্যালিটি নিয়ে কথা হবে৷ এমন খুশির মূহুর্তে মানুষকে চমকে দেয়া ভালো। ওনার মৃদু হাসি দেখে বললাম,
- "আপনার মরার সময় হয়েছে ভাই।"
এনাম ভাইয়ের মুখ কালো হয়ে গেলো। চা খেতে ডেকে এভাবে অলক্ষুণে কথা শুনতে হবে জানলে দাওয়াতই দিতেননা তিনি।
- "তোমার কেন মনে হয় আমার মরার সময় হইছে?"
- "কারন আপনি অত্যাধিক খুশি"
- "তো?"
- "সুখ আপনার চেহারায় কিলবিল করছে।"
- "এইটার সাথে মরার কী সম্পর্ক?"
- "আমার দাদাজান ছিলেন এলাকার এমাম। তিনি বলেছিলেন সুখের পরেই মরণ আসে। আপনার কি ধারনা তিনি মিথ্যা বলেছেন?
- " না।"
এনাম ভাই গম্ভীর হয়ে গেলেন। চোখ ছলছলে৷ মরার খবর শুনতে কারোই ভালো লাগে না৷ আমারও লাগলো না৷ আমার খুব দু:খ হলো। বেচারা। কত উপন্যাস লিখে পাঠিকাদের মন জয় করেছে। তার মৃত্যু হলে পাঠিকাদের কী হবে সেই চিন্তায় বেদনা ভর করে আমার মনে।
- কেমন মৃত্যু হবে আমার?
- অনেক মানুষ আলাপ করবে মৃত্যু নিয়ে। তবে মৃত্যু হবে অল্প আয়োজনে।
- মৃত্যুর আবার আয়োজন হয়?
- হয় তো!
- আমার হাতে সময় কয়দিন?
- কিসের?
- বাঁচবো কতদিন?
- শিওর না৷ বেশিদিন নাই। পরেরবার গ্রামে গেলেই মৃত্যু হবে৷
- গ্রামের সাথে মৃত্যুর কী সম্পর্ক?
- গ্রামে আপনার বাবা মা থাকে।
- বাবা মা দিয়া কাজ কী?
- ওনারা মত না দিলে তো মরবেন না।
- আমার মৃত্যুতে আব্বা আম্মার হাত থাকবে?
- আলবত থাকবে।
এনাম ভাই ব্যথিত হলেন। নিচে তাকিয়ে আছেন। শ্বাস ভার। আমি চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে উঠে গেলাম। এনাম ভাই তখনো নিচে তাকিয়ে৷ মোসাফা করার সময় বললাম,
- ভাই একটা জিনিস মনে রাখবেন। মানুষ মরে দুইভাবে। শ্বাস বন্ধ হয়ে গেলে৷ আর ঘরে বউ আনলে।
এনাম ভাই আগের মতোই কিছু না-বোঝার মতন হা করে তাকিয়ে রইলেন। আমি সেদিকে না তাকিয়ে বের হয়ে গেলাম বাইরে৷ তখন আকাশে একটি পাখি উড়ে গেলো৷
Comments
Post a Comment