কোনো এক বইমেলার রাতে ভীষণ মন খারাপ হলো
নাঈম খন্দকার রুম্মান
বইমেলার স্টলে বসে ছিলাম৷ তখন কেবল মেলায় পাঠক আসতে শুরু করেছে ৷ ওদিকে সূর্য বিদায় নেবে বলে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে৷ আনমনে তখন ভাবতে থাকি নানান কিছু৷ যে ভাবনায় থাকে দর্শন, কবিতার লাইন, গল্পের গল্প কিংবা কারো বিশেষ কোনো স্মৃতি৷
দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়৷ তখন মেলায় পাঠকের আনাগোনা বেশ ভালো৷ কিছু পাঠক স্টলে এসে বই কিনে চলে যায়। এরপর নামে সন্ধ্যা৷ আর প্রায় সাথে সাথে স্টলে কিছু মেয়ে আসে৷ কালো বোরকা পরিহিতা। মাথায় গোলাপ ফুলের টুপি৷ হাতে মেহেদী দিয়ে আঁকা নানান ফুল৷ অনেকে মিষ্ট ভাষায় কথা বলে। কেউকেউ খুব মায়াবী চোখের উপর চশমা পরেছে৷ তারা জানতে চায় কোন বইটি ভালো৷
প্রতিটা বইয়ের বিষয় আমি বুঝিয়ে দিই৷ তারা মুগ্ধ হয়ে শোনে৷ মানুষ যখন কথার প্রতি মনোযোগী হয় বা মুগ্ধ হয়, তখন তাদের চোখ থাকে স্থির। পলকও পড়ে না৷ কথার তালে তালে অজান্তেই মাথা ঝাঁকে৷ আমার কথার শেষে তারা আবার জানতে চায় নতুন কিছু। আমি আবার কথা বলি৷ তারা সেরা উপন্যাস নিতে চায়। যা তাদের পছন্দ হবে৷ আমি "মেঘের কোলে রোদ" আর "নুসাইবা" ক্রয় করতে বলি। তারা ক্রয় করে৷ কিছু টাকা ডিসকাউন্ট দিতে বলে। আমি দেই না৷ অত:পর আমাকে কঠোর নির্দয় বলে বিদায় নেয়৷ আমি রশিদে টুকে রাখি কত টাকা বিক্রি হলো৷ অত:পর মৃদু হেসে বের হই কফি পানের উদ্দেশ্যে।
রাত ন'টায় মেলা শেষ হয়৷ আমি আর সাথে থাকা বড়ো ভাই নানান আড্ডায় মেতে উঠি৷ ধীর পায়ে এগিয়ে যাই মেট্রোর উদ্দেশ্যে৷ মাঝখানে কিছু সময় নীরবতা। আমি হতাশ হয়ে যখন আকাশে চোখ বুলাই, তখন জ্বলজ্বল করে জ্বলে আকাশের রূপসী চাঁদ। আমি চাঁদকে দেখি৷ দেখতে দেখতে ভাবতে থাকি। নানান প্রশ্নের জন্ম নেয়৷ সালেহুলও হয়তো বিষণ্ণ তখন। কারণ সোলায়মান তখনও পৌঁছায়নি তার বাসায়। তাই উদাস মনে সালেহুল চাঁদ দেখছে। আর ভাবছে, নাঈম বেদাতি এলে মন্দ হতো না৷ সালেহুল দু:খী। অথচ তা প্রকাশ করতে পারে না৷ তারও হয়তো চোখ ছলছল করে ওঠে, হয়তো যন্ত্রণার ঝড় বয়ে যায় তার হৃদয়ে। অথচ আমি দেখি সালেহুল হাসে৷
তানভিরের মনে তখন এপিটাফের সুর৷ হুমায়ূনের উক্তি পোস্ট করে কতকালই-বা লুকিয়ে রাখবে নিজেকে সে? নিজের দু:খগুলো মেলে ধরে সবার সামনে। অথচ দু:খ এত দূর্বোধ্য ভাষায় লেখা যে, তা কেউ পড়তে পারে না, কেউ বুঝতে পারে না৷ তানভির তাই কানে হেডফোন গুঁজে তাকিয়ে থাকে চাঁদের দিকে। যে চাঁদ ঝলসে গিয়েছে কিছুকাল আগে৷
বন্ধু রাফিন ভেবে পায় না তার টাকা আদৌ ফেরত পাবে কিনা। তবে আমার উপর এতটুকু বিশ্বাস তার আছে, আমি টাকা মেরে দেবো না। তবুও তার মন ভার৷ ধকধক করে তার বুক। স্মৃতিতে দোল নাড়ায় রাতের মৃদু বাতাস। চশমা খুলে রাফিন চাঁদের দিকে তাকায়। হারিয়ে যায় দু:খের মাঝে।
কখনো দেখা হলে সালেহুল, রাফিন অথবা তানভির খিলখিল করে হাসে। মেতে ওঠে কতশত কমেডিতে৷ তবে তা যেনো মুখোশ। যে মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে আছে ছলছলে চোখ আর কাপা কাপা ঠোঁট৷ তবে দু:খের ভাষা বোঝে না কেউ। তাই তারা হাসে৷ খিলখিলিয়ে হাসে।
Comments
Post a Comment